দূর্গা পূজার আমেজ শুরু হয়ে গেছে, আর কিছুদিন পরেই মহালয়া। বাঙালি পরিবার গুলোতে জামাকাপড় কেনার ধুম শুরু হয়ে গিয়েছে। গোটা পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে বিভিন্ন মণ্ডপে মণ্ডপে প্যান্ডেল গড়ার মুহূর্ত গুলো অনুভব করা যাচ্ছে। আজ থেকে প্রায় ১২০ বছর পূর্বে দূর্গা পূজো গুলো জমিদার বাড়ী পর্যন্ত সীমিত ছিল। ১৯১০ সাল নাগাদ এই পূজো জমিদার বাড়ীর দালান থেকে আস্তে আস্তে বারোয়ারি পুজোর দিকে অগ্রসর হয়। ১৯৬০ সাল নাগাদ দূর্গা পুজোয় সাংস্কৃতিক বৈচিত্র আসতে শুরু করে। ধীরে ধীরে থিম পূজোর চল শুরু হয়। ২০২৬ সালের কলকাতার ৬০ টি পূজোর থিম নিয়ে এখানে আলোচিত হল।
1) হরিদেবপুর অজেয় সংহতি-র পুজোয় বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে ভারতের শিল্পচর্চায় জাতীয়তাবাদের প্রকাশ ঘটার যে সূচনা হয়, তাকেই স্মরণ করে বিষয়ভাবনা: ‘স্বতন্ত্র’।
2) সন্তোষপুর ত্রিকোণ পার্ক : দুর্গাপুজোর সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। প্রকৃতি থেকে আহরিত নবপত্রিকা ছাড়া পুজো শুরু হয় না। বাঙালির কাছে শরৎ ঋতুর সব থেকে বড় পরিচায়ক কাশ আর শিউলি, যা দুর্গাপুজোরও বার্তাবহ। সর্বোপরি গ্রামবাংলার চিরন্তন মৃন্ময়ী প্রতিমা তৈরি হয় প্রায় সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপাদান থেকে যা বিসর্জনের পরে আবার প্রকৃতিতেই মিশে যায়। এই চেতনা নিয়েই পুজোর বিষয়ভাবনা: ‘প্রকৃতি’।
3) মাস্টারদা স্মৃতি সংঘ : সীতাহরণের পরে রামের যে সংকল্প, শুধু সীতা-উদ্ধারই নয় রাবণের হাত থেকে সমগ্র পৃথিবীকে রক্ষা করা, সেই লক্ষ্যপুরণের কাহিনি নিয়েই উপস্থাপনা। এই অভীষ্টসিদ্ধির পথে তিরধনুকই তাঁর প্রধান সহায়। শত্রুদমনেও যেমন, দেবীর আরাধনাতেও ঠিক ততটাই। রামের তিরধনুককে লক্ষ্যভেদের মূল প্রতীক হিসেবে ধরে নিয়ে বিষয়ভাবনা: ‘সংকল্প’।
4) খিদিরপুর পল্লি শারদীয়া দুর্গোৎসব : বিষয়ভাবনা: ‘চল যাব তোকে নিয়ে’। নিছক আহ্বান নয়, এ যেন স্মৃতির হাত ধরে ফিরে যাওয়ার আমন্ত্রণ। ফিরে যাওয়া সেই কলকাতায়, যেখানে ট্রামের ঘণ্টাধ্বনি ছিল শহরের হৃদস্পন্দন।
5) রাজডাঙা নব উদয় সংঘ: পৃথিবীর সামনে আজকে ঘোর দুর্দিন। নির্বিচারে ধ্বংস হচ্ছে পশুপাখিদের বাসস্থান, প্রাকৃতিক বনভূমি। স্বাভাবিক ভৌগোলিক পরিবেশকে মানুষ ধীরে ধীরে কৃত্রিম, বন্ধ্যা করে তুলছে। সেটা অনুভব করা যাচ্ছে না তা নয়, নানা ভাবে হয়তো তা শুধরে নেওয়ারও চেষ্টা হচ্ছে। কিন্তু সেই প্রয়াস নানা কারণে এখনও সঠিক বা যথেষ্টর ধারেকাছেও নয়। এই নিয়েই বিষয়ভাবনা: ‘শোধন’।
6) উত্তর কলকাতা সর্বজনীন দুর্গোৎসব সমিতি: -র বিষয়ভাবনা: ‘জলছাপের কলকাতা’। অষ্টাদশ ও উনবিংশ শতকের সন্ধিক্ষণে উত্তর কলকাতার প্রাণকেন্দ্র চিতপুরে জন্ম নিয়েছিল এক অনন্য শৈল্পিক ধারা। সেই ঐতিহাসিক সময়ের জলরং ও তুলির টান বিশেষত কোম্পানির আমলে দেশীয় পটশিল্পী ও কারিগরদের নিপুণ দক্ষতায় ব্রিটিশ রুচির সংমিশ্রণে যে ছবিগুলো আঁকা হয়েছিল, তাতে ধরা পড়েছিল সমকালীন কলকাতার জনজীবন আর পুরনো স্থাপত্যের নিখুঁত রূপরেখা। এই শিল্পধারাই নতুন করে তুলে ধরা হবে পুজোর মণ্ডপে।
7) দক্ষিণের ৭১ পল্লি বৈশাখী সর্বজনীন দুর্গোৎসব সমিতি-র মণ্ডপের বিষয়ভাবনা: ‘মন্থন-দর্পণ’। আধুনিক সভ্যতার চরম ভোগবাদ ও দায়িত্বহীনতার জেরে নদী, সমুদ্র আর জলাশয়গুলো ঢেকে গেছে বিষাক্ত প্লাস্টিক, রাসায়নিক বর্জ্য আর আবর্জনার স্তূপে। মণ্ডপসজ্জায় এই সংকটকেই তুলে ধরা হয়েছে রূপক দর্পণ হিসেবে।
8) খিদিরপুরের গোপাল ডাক্তার রোড যুবক সংঘ: বিষয়ভাবনা: ‘মানবতা’। বেঁচে থাকার জন্যে মানুষের ন্যূনতম কাম্য খাদ্য, বস্ত্র আর বাসস্থান। বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেক মানুষেরই হয়তো কোনও না কোনওটার অভাব আছে। সমাজের দেখা উচিত যাতে যার যা অভাব সেটা মেটানো যায়, আর যতক্ষণ সেটা না হচ্ছে, ততক্ষণ যেটুকু আছে তা যেন কেড়ে না নেওয়া হয়। ধর্ম জাতি ভেদাভেদ ভুলে এইটা করতে পারাটাই মানবতা।
9) গান্ধী কলোনির অভিযান ক্লাব: -এর পুজোয় বিষয়ভাবনা: ‘শুভ্র শান্তি’। তিন হাজার কৃত্রিম শুভ্র শতদলে ঘেরা মণ্ডপে বিরাজ করবে অপার শান্তির ভাব।
10) বাঁশদ্রোণীর সূর্যনগর সর্বজনীন দুর্গাপুজোর মূল ভাবনা ‘উদযাপন’। মণ্ডপশৈলীতে থাকবে বিহার ও পশ্চিমবঙ্গ, দুই প্রতিবেশী রাজ্যের দুই পটচিত্র গ্রাম মধুবনী আর পিংলার শিল্পকলার মেলবন্ধন।
11) কালীঘাট মিলন সংঘ: দেশ-কাল-সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে বিষয় ভাবনা হিসেবে বেছে নিয়েছেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে উৎসর্গ করা রবীন্দ্রনাথের রূপকধর্মী নাটক তাসের দেশ। উপস্থাপনার মধ্যে নিহিত থাকবে শৃঙ্খলাবদ্ধ নিয়মের আগড় ভেঙে মুক্ত মনের ধারাকে প্রতিষ্ঠা করার চেতনা।
12) বাঘাযতীন বিবেকানন্দ মিলন সংঘ : ৭৭ তম বর্ষ, এবারের ভাবনা 'প্রণতিতে জয় ' রামচন্দ্রের ডাকে অকালে মা জগৎ জননীর আগমন।
13) চালতা বাগান লোহাপট্টি : বিষয় ভাবনা 'নিশান' উলকি বা ট্যাটু
14) অবসর সর্বজনীন-এর বিষয়ভাবনা: অন্য যেখানে অনন্য
15) দমদম তরুণ দল : শিল্পে, মহাকাব্যে, সমাজে, রাজনীতিতে, প্রকৃতিতে, সব জায়গায় আমরা দেখতে পাই পারস্পরিক নির্ভরতা আর সংযোগের সফল মেলবন্ধন। দেবী দুর্গার সৃজনই যেমন দেবতাদের সম্মিলিত শক্তির জোট। এই সমষ্টিবদ্ধতা নিয়েই দমদম তরুণ দল-এর বিষয়ভাবনা: ‘জোট’।
16) রাজডাঙা আমরা কজন কল্যাণ সমিতি: রাজডাঙা আমরা কজন কল্যাণ সমিতি-র পুজো উৎসর্গীকৃত গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতি। তাঁর জন্মের ১৬০ বছরের প্রারম্ভে তাঁর বহুমুখী জীবনের নানা দিক এবং অবশ্যই চিত্রকলা ফুটে উঠবে মণ্ডপের উপস্থাপনায়। গগনেন্দ্রনাথের ধারায় প্রভাবিত পরবর্তীকালের চিত্রীদেরও কাজ দেখা যাবে মণ্ডপে। বিষয়ভাবনা: ‘উৎসারিত আলো’।
17) চালতাবাগান সর্বজনীন: বিষয়ভাবনা: ‘পরম্পরা’। মা দুর্গা মুক্তকেশী, রণরঙ্গিণী। এই মুক্তকেশ নারীজীবনের আবেগ, আত্মসম্মান, শক্তি ও ক্ষতের প্রতীক। এই চুলই নারীর দুর্বলতার অঙ্গ হয়ে সমাজের হাতে মুষ্টিলগ্ন হয়। ক্যান্সারের মতো নিষ্ঠুর বাস্তবতার সামনে কখনও আত্মপরিচয় নিয়ে ঝরে পড়ে, আবার চুল দানের মাধ্যমে এক নারী অন্য এক নারীর বুকে ফিরিয়ে দেয় আত্মবিশ্বাস ও বাঁচার ইচ্ছা। চুল নিয়েই তাই এবারের বিষয়ভাবনা: পরম্পরা।
18) দক্ষিণ কলকাতার সমাজসেবী সংঘ: উত্তমকুমারের জন্মশতবর্ষের উদযাপনে সমাজসেবী-র পুজো মহানায়ক উত্তমকুমারের উদ্দেশে নিবেদিত। উত্তমকুমারের অভিনীত চলচ্চিত্রের রোমন্থন, তাঁর জীবনের খণ্ডস্মৃতি, তুলে ধরা হবে তাঁরই সময়ের প্রেক্ষাপটে। বিষয়ভাবনা: ‘মহাপূজায় মহানায়ক’।
19) নাগেরবাজার সন্নিহিত তেলিপুকুর নার্সারিবাগান যুব সংঘ: পাড়ার মাঝখানে ফুসফুসের মতো একটা ছোট্ট পুকুর। পরিস্থিতির চাপে ছোট হয়ে গেলেও সে হারিয়ে যায়নি। এই পুকুরকে ঘিরেই উপস্থাপনা। মানুষের জীবনের সঙ্গে পুকুর যেরকম ওতপ্রোতভাবে জুড়ে আছে, সেই উপলব্ধি, মানুষের ও পুকুর উভয়ের সত্তার সেই চিরন্তন যোগসূত্র ধরেই বিষয়ভাবনা: ‘এক পুকুর ভালোবাসা’।
20) লেকটাউন অধিবাসী বৃন্দ: বিষয়ভাবনা: ‘আর্তি’। মানুষের নির্বিচার দহনের ফলে পৃথিবীর বনজঙ্গল আজ ধ্বংস হতে চলেছে। জীবজন্তুরা তাদের স্বাভাবিক বাসস্থান হারিয়ে বিপন্ন থেকে বিপন্নতর হয়ে বিলুপ্তির মুখে। শিল্পী প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরি পরিবেশবান্ধব মণ্ডপে তাদেরই অন্তরের আর্তনাদ ফুটিয়ে তুলবেন। বন্দে মাতরম গীত রচনার ১৫০ বছর পূর্তিতে গৌরীবেড়িয়া সর্বজনীন-এর এ-বছরের পুজো ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রতি উৎসর্গীকৃত। বিষয়ভাবনা: নাম ‘বঙ্কিম’।
21) নিউটাউন সার্বজনীন : বিষয়ভাবনা: ‘পদ্মভূষণ’। পদ্মভূষণ যে শুধু ভারতের তৃতীয় সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান তাই নয়, দেবীর ভূষণও। বাংলাও যেন একদিন সেভাবেই দেশমাতৃকার ভূষণ হয়ে ওঠে সেই চেতনাই রূপ পাবে মণ্ডপে।
22) সন্তোষপুর লেক পল্লি-র বিষয়ভাবনা: ‘তাণ্ডব’। সতীর দেহত্যাগের শোকে উন্মত্ত মহাদেব যে তাণ্ডব নাচ নেচেছিলেন অভিনবতম আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে সেই প্রলয়-প্রাবল্য ফুটে উঠবে কলকাতার বুকে।
23) বাগুইহাটি অশ্বিনীনগর বন্ধুমহল ক্লাব: বাগুইহাটির উপস্থাপনা প্রবীণ নারীদের অদৃশ্য অথচ চিরন্তন শক্তির প্রতি শ্রদ্ধা। সমাজ প্রায়শই তাঁদের অপ্রয়োজনীয় বলে মনে করলেও, তাঁদের জীবন, অভিজ্ঞতা, ভালোবাসা ও ত্যাগ পরবর্তী প্রজন্মের অস্তিত্বের ভিত গড়ে তোলে। দেবী দুর্গা তাঁদের মধ্যেই উপস্থিত থাকেন, যাঁদের নীরব শক্তি সময়ের সঙ্গে আরও গভীর হয়ে ওঠে। এই কাজ সেই চিরন্তন অধরা শক্তিকেই অনুভব করার একটি প্রচেষ্টা। বিষয়ভাবনা: ‘রোপণ’।
24) হাতিবাগান নবীন পল্লি: এবারের কাজ তাঁর প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য। বিষয়ভাবনা: ‘হাসিখুশি পুজো’।বাঙালির ঘরে ঘরে একটা সময় শিশুশিক্ষা শুরু হত যোগীন্দ্রনাথ সরকারের ‘হাসিখুশি’ বইটি দিয়ে। কালের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কোথায় যেন হারিয়ে যাচ্ছে ‘অ-এ অজগর আসছে তেড়ে’-র সেই পরিচিত সুর। শিশুদের মনস্তত্ত্ব বুঝে মাতৃভাষা বাংলায় অক্ষর চেনানোর কাজ যাঁরা শুরু করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে যোগীন্দ্রনাথ পথিকৃৎ।
25) সন্তোষ মিত্র স্কোয়ার সর্বজনীন দুর্গোৎসব সমিতি: -র ৯১তম পুজোর সামগ্রিক সৃজনের গুরুদায়িত্বে আছেন শিল্পী। এ-বছরের পুজো ভারতবর্ষের সনাতন সভ্যতা, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য। বিষয়ভাবনা: ‘সনাতন চেতনায় বন্দে মাতরম্’। স্বাধীনতা সংগ্রামে যাঁরা দেশের জন্যে আত্মোৎসর্গ করেছেন, তাঁদের শ্রদ্ধার সঙ্গে
26) দক্ষিণ কলকাতার বেহালা ইয়ংমেন্স অ্যাসোসিয়েশন- নদীমাতৃক দেশে নদীর সমস্যা, জলদূষণ ইত্যাদি নিয়ে নান্দনিক কাজ। বিষয়ভাবনা: 'জললিপি'।
27) সল্টলেক ই সি ব্লক-এর সুবর্ণ জয়ন্তী বর্ষ: মহাভারতকে কেন্দ্র করে একটা পূর্ণাঙ্গ কাজ। মহাভারতের প্রতিটি ঘটনাই আজকের সমাজব্যবস্থাতেও প্রবল ভাবে প্রাসঙ্গিক। সেই সূত্রই তুলে ধরে দেখানো থাকবে মহাভারতের আঠারোটি পর্বের প্রতিটি থেকে। বিষয়ভাবনা: 'অক্ষৌহিণী'।
29) চেতলা অগ্রণী: খড় আর পেপার পাল্প দিয়ে গড়ে উঠবে মণ্ডপ। বিষয়ভাবনা: ‘বিশ্বরূপে বিশ্বরূপিণী’। একই নারী তিনি দশভুজা। কখনও যুদ্ধ করছেন, কখনও বা গঙ্গা হয়ে প্রবাহিত হয়ে চলেছেন, কখনও গৃহিণী হয়ে সংসার চালাচ্ছেন। এই আমাদের দেবীর বিশ্বরূপ, যা আলো করে তুলবে অগ্রণীর পুজো প্রাঙ্গণ।
30) চেতলার প্রসন্নময়ী ঘাট: এর দুর্গোৎসবের এ-বছর শতবর্ষ পূর্তি। মায়ের অবস্থান ঘাটের উপরেই। ঘাটের একশো বছরের ইতিবৃত্ত নিয়ে বিষয়ভাবনা: ‘শুদ্ধি-সমৃদ্ধি’।
31) লেকটাউন নেতাজি স্পোর্টিং ক্লাব: বিষয়ভাবনা: 'নগর কথা'। একসময় প্রায় মেনেই নেওয়া হয়েছিল ১৬৯০ সালে ভিনদেশি জোব চার্নকের পদার্পণেই নাকি শহর কলকাতার জন্ম। কিন্তু ১৫৯৬ সালে দিল্লি দরবারের তোষাখানায় জমা পড়েছিল 'পরগনা কলিকাতা'-র রাজস্ব। ১৬১০ সালে সাবর্ণ রায়চৌধুরীদের জায়গিরদারি পাওয়ার আগে থেকেই ওলন্দাজ, ফরাসি আর পর্তুগিজদের পদচারণায় মুখরিত হত সুতানুটি বন্দর। ২০০৩ সালের ১৬ মে, কলকাতা হাইকোর্টে প্রতিষ্ঠিত হয়, এই নগরের অস্তিত্ব কোনও বিদেশির দান নয়, ১৬৯০-এর আগেও সে স্বমহিমাতেই ছিল। সেই আত্মপরিচয়ের দলিল হয়েই এবার সেজে উঠবে লেকটাউন নেতাজি স্পোর্টিং ক্লাব-এর মণ্ডপ।
32) পার্ক স্ট্রিট অ্যালেন পার্ক: ভাবনায় পূর্ণতা পাবে শিব-তাণ্ডব।
33) চক্রবেড়িয়া সর্বজনীন: এর মাঠে এবার সৃজিত হবে পদ্মদীঘি। মায়ের অধিষ্ঠান যেন জলের তলায়। ৯০০টি পাতা আর ১০৮টি পদ্মফুল দিয়ে তৈরি কৃত্রিম পদ্মবনের মধ্যে দিয়ে নেমে যাবেন দর্শকেরা, মাথার উপরে খেলে বেড়াবে কৃত্রিম মাছ। বিষয়ভাবনা: ‘পদ্মদীঘির ঘাটে’।
34) পূর্বাচল আমরা সবাই ক্লাব: এখানে বিষয়টা খুবই চিত্তাকর্ষক। ছোট শিশুদের বড় করার সময়ে তাদের সাবধান করতে বা তাদেরই ভালোর জন্যে তাদের দিয়ে কিছু করাতে মায়েদের অনেক সময়ে নানা রকম ছোট ছোট মিথ্যে কথার আশ্রয় নিতে হয়— এই নিয়েই বিষয়ভাবনা: ‘মায়েরা মিথ্যা বলে’।
35) বিরাটির কিশোরপাড়া সর্বজনীন: বাউলগ্রাম। বাউলদের অঙ্গে ধারণের বস্ত্রখণ্ডের স্বাভাবিক রং নিয়ে বিষয়ভাবনা: ‘এবার গেরুয়া’।
36) বেহালা প্লেয়ার্স কর্নার-এর বিষয়ভাবনা: ‘বিবর্তন’। দুর্গাপুজোর বনেদিয়ানা থেকে আজকের কর্পোরেট ইভেন্ট-এর যে যাপন, তাকেই তুলে ধরা হচ্ছে ফটো-আর্কাইভের মাধ্যমে।
37) শ্যামা পল্লি শ্যামা সংঘ: বিষয় ‘তুরঙ্গ’
38) জোড়াসাঁকো ৭-এর পল্লির বিষয়ভাবনা: ‘লিপন কাম’। গুজরাতের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সাধারণের বাড়ির দেওয়ালে ফুটিয়ে তোলা ‘মাটি ও-মুকুর’ শিল্প বিখ্যাত। সৌন্দর্যকে সর্বজনীন করা এবং সেই সব দুঃস্থ শিল্পীদের পাশে দাঁড়ানোই পুজোর উদ্দেশ্য।
39) বাগুইহাটি উদয়ন সংঘ: মণ্ডপসজ্জায় দেখা যাবে মধ্যপ্রদেশের গোন্ড শিল্পকলা এবং আধুনিক ইন্টেরিয়র ডিজাইন-এর একশৈল্পিক সংমিশ্রণ। বিষয়ভাবনা: ‘পুনর্জীবন’।
40) বেলেঘাটা সন্ধানী: মণ্ডপ গড়ে উঠবে শান্তিনিকেতনের কাছের উপাসনা মন্দিরের ধাঁচে। আবার ভিতরে দেবীর অধিষ্ঠানের প্রেক্ষাপট নির্মিত হবে বেনারসের অন্নপূর্ণা মন্দিরের আদলে। বিষয়ভাবনা: ‘দেবায়তন’।
41) বেহালা নূতন দল: পূজাপ্রাঙ্গণে এবারে শিল্পীর নিবেদন ‘পার্বণ’।
42) চালতাবাগান সর্বজনীন : বিষয়ভাবনা: ‘পরম্পরা’। মা দুর্গা মুক্তকেশী, রণরঙ্গিনী। এই মুক্তকেশ নারীজীবনের আবেগ, আত্মসম্মান, শক্তি ও ক্ষতের প্রতীক। এই চুলই নারীর দুর্বলতার অঙ্গ হয়ে সমাজের হাতে মুষ্টিলগ্ন হয়। ক্যানসারের মতো নিষ্ঠুর বাস্তবতার সামনে কখনও আত্মপরিচয় নিয়ে ঝরে পড়ে, আবার চুল দানের মাধ্যমে এক নারী অন্য এক নারীর বুকে ফিরিয়ে দেয় আত্মবিশ্বাস ও বাঁচার ইচ্ছা। চুল নিয়েই তাই এবারের বিষয়ভাবনা: পরম্পরা।
43) খিদিরপুর ৭৫ পল্লি : বিষয়ভাবনা: ‘পরাশ্রয়— এক চিরন্তন সত্য’ পরভৃত কোকিল অন্যের বাসায় ডিম পেড়ে রেখে যায় নিজের ভবিষ্যতে, অনাত্মীয় কেউ অজান্তেই তাকে বড় করে তোলে। মানুষও তেমনই এই পৃথিবীর বুকে এক আশ্রিত প্রাণ। প্রকৃতির দানে তার অস্তিত্ব। অথচ তারাই আবার নিজের লোভে সেই আশ্রয়কে ধ্বংস করে। পরিবর্তে মানুষ যদি সহাবস্থানের ভাষা শেখে, মানবতার ভবিষ্যৎ এখনও বেঁচে যায়।
44) পশ্চিম পুটিয়ারি পল্লি উন্নয়ন সমিতি-র পুজোর বিষয়ভাবনা: ‘অনামিকা’।
45) পল্লি শারদীয়া : কলকাতার প্রথম বৈদ্যুতিক ট্রামের যাত্রা। মণ্ডপের প্রতিটি শিল্পরূপ দর্শনার্থীদের ফিরিয়ে নিয়ে যাবে পুরনো কলকাতার অলিগলি, ট্রামের কাঠের কামরা, ঘণ্টাধ্বনি আর পুজোর পরিচিত আবেগে।
46) রাজডাঙ্গা নব উদয় সংঘের পুজো: পৃথিবীর সামনে আজকে ঘোর দুর্দিন। নির্বিচারে ধ্বংস হচ্ছে পশুপাখিদের বাসস্থান, প্রাকৃতিক বনভূমি। স্বাভাবিক ভৌগোলিক পরিবেশকে মানুষ ধীরে ধীরে কৃত্রিম, বন্ধ্যা করে তুলছে। সেটা অনুভব করা যাচ্ছে না তা নয়, নানা ভাবে হয়তো তা শুধরে নেওয়ারও চেষ্টা হচ্ছে। কিন্তু সেই প্রয়াস নানা কারণে এখনও সঠিক বা যথেষ্ট ধারেকাছেও নয়। এই নিয়েই বিষয়ভাবনা: ‘শোধন’।
47) উত্তর কলকাতা সর্বজনীন দুর্গোৎসব সমিতি-র বিষয়ভাবনা: ‘জলছাপের কলকাতা’। অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতকের সন্ধিক্ষণে উত্তর কলকাতার প্রাণকেন্দ্র চিতপুরে জন্ম নিয়েছিল এক অনন্য শৈল্পিক ধারা। সেই ঐতিহাসিক সময়ের জলরং ও তুলির টান বিশেষত কোম্পানির আমলে দেশীয় পটশিল্পী ও কারিগরদের নিপুণ দক্ষতায় ব্রিটিশ রুচির সংমিশ্রণে যে ছবিগুলো আঁকা হয়েছিল, তাতে ধরা পড়েছিল সমকালীন কলকাতার জনজীবন আর পুরনো স্থাপত্যের নিখুঁত রূপরেখা। এই শিল্পধারাই নতুন করে তুলে ধরা হবে পুজোর মণ্ডপে।
48) দক্ষিণে ৭১ পল্লি বৈশাখী সর্বজনীন দুর্গোৎসব সমিতি-র মণ্ডপের বিষয়ভাবনা: ‘মন্থন-দর্পণ’। আধুনিক সভ্যতার চরম ভোগবাদ ও দায়িত্বহীনতার জেরে নদী, সমুদ্র আর জলাশয়গুলো ঢেকে গেছে বিষাক্ত প্লাস্টিক, রাসায়নিক বর্জ্য আর আবর্জনার স্তূপে। মণ্ডপসজ্জায় এই সংকটকেই তুলে ধরা হয়েছে রূপক দর্পণ হিসেবে।
49) যোধপুর পার্ক ৯৫ পল্লি : মানসিকভাবে পুরুষ ও নারী উভয় সত্তাই বর্তমান, তাঁদের নিয়ে উপস্থাপনা। মণ্ডপের নির্মাণে প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হবে এমন সব প্রাত্যহিক জীবনের উপকরণ যা দ্বৈত-সত্তার সংযোগ ছাড়া সম্পূর্ণ হয় না, যেমন ইউ-এস-বি পোর্ট, নাট-বল্টু, জিপার ইত্যাদি।
50) ত্রিধারা সম্মিলনী-র পটভূমি তিব্বতের ল্যান্ডস্কেপ, সেখানকার জনজীবন আর শিল্প-সংস্কৃতি।
51) এন্টালি ১৪-র পল্লির মণ্ডপ গড়ে উঠবে দুর্গামন্দিরের পরিকল্পনায়, বিষয়ভাবনা: ‘বেদভূমি’।
52) কেষ্টপুর প্রফুল্লকানন (পশ্চিম) অধিবাসীবৃন্দের পুজোয়। বিষয়ভাবনা: ‘যাঁহাতে মন রমি’। প্রায় দুই শতাব্দীপ্রাচীন এক দলিত সম্প্রদায়কে যখন জাতিভেদের জন্য মন্দিরে ঢোকার অনুমতি না দেওয়া হয়, তখন ঈশ্বরপ্রেম হয়ে ওঠে তাদের প্রতিবাদের ভাষা। ছত্তীসগড়ের রামনামী সম্প্রদায়ের মানুষেরা শারীরিক দেবতা বা মূর্তির পরিবর্তে সম্পূর্ণ ভাবে রামের নামের উপর মনোযোগ দেন। তাঁদের কাছে রাম হলেন সর্বব্যাপী এবং রূপহীন পরম সত্য। রামনামকে আগলে ধরে তাঁদের সাধনা।
53) উল্টোডাঙা অরবিন্দ সেতু-র সুবর্ণ জয়ন্তী। বিষয়ভাবনা: ‘সুবর্ণ রূপমালা’। ভারতীয় শিল্প, লোকঐতিহ্য ও সমকালীন সৃজনশীলতার ভাণ্ডারে দেবী দুর্গা অগণিত রূপে, অসংখ্য শিল্পভাষায় প্রকাশিত হয়েছেন। মাটির মূর্তি, পটচিত্র, টেরাকোটা, ধাতু, কাঠ, বস্ত্র, মুখোশ, আল্পনা কিংবা আধুনিক বিমূর্ত শিল্পে। পুজোর পঞ্চাশ বছর উপলক্ষে মণ্ডপে উপস্থাপিত হবে পৃথক শৈলী এবং পৃথক নন্দনচেতনায় শিল্পিত পঞ্চাশটি দুর্গার রূপ।
54) গড়পাড়ের হরিনাথ দে রোড-এর পুজোর শতবর্ষে বিষয়ভাবনা: ‘শাশ্বত বন্ধন’। মাটির গভীরে থাকা শিকড়ের নীরব অস্তিত্বেই গাছের পরিচয়। বাকি অংশ যতই দৃষ্টিনন্দন হোক না কেন, তার সমস্ত সৌন্দর্যের উৎস হল শিকড়। মানুষের পরিবারও তেমনই এক শিকড় বাকি সবাই গাছের শাখাপ্রশাখা। উপস্থাপনার মধ্যে নিহিত থাকবে মানুষের এই শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন না হওয়ার বার্তা।
55) বেলেঘাটার সুরা স্পোর্টিং ক্লাব-এর ৪৫তম বর্ষের পুজোয় বিষয়ভাবনা: ‘চিরন্তনী’। জমিদারবাড়ির আঙিনা ছেড়ে দুর্গাপূজোর বারোয়ারি হয়ে ওঠা আর তার ধর্মীয় সত্তার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক সত্তার অসামান্য বিকাশ দুর্গাপুজোকে এক অন্য স্তরে উত্তীর্ণ করেছে। দেবী দুর্গা আজ শুধু আরাধ্যাই নন, তিনি জনজীবনের নানা ভাবনার প্রতীক। চিরন্তনীর এই দীর্ঘযাত্রাই ধরা থাকবে মণ্ডপে।
56) দমদম পার্ক সর্বজনীন-এ। বিষয়ভাবনা: ‘পঞ্চালিকা’। বাংলার দুই হারিয়ে যেতে বসা পুতুলনাচের সংস্কৃতি বেণী-পুতুল আর ডাং-পুতুল নিয়ে কাজ। শুধু পুতুলনাচই নয়, তার নেপথ্যে থাকা শিল্পীদের পরিশ্রম, কুশলতা, সুখ-দুঃখ ইত্যাদিও ফুটে উঠবে কাজের মধ্যে দিয়ে।
57) উল্টোডাঙা বিধান সঙ্ঘ: মহাবিশ্বের যা কিছু জাগতিক বা মহাজাগতিক তার অধিকাংশই মূর্ত, আর বাকি যা যা পড়ে থাকে তাই অমূর্ত। পৌরাণিক কাল থেকেই দেবদেবীদের মূর্ত রূপ কল্পনা করা হলেও, ঈশ্বর বা সর্বশক্তিমান যিনি সর্বত্র বিরাজমান, তিনি আসলে অমূর্ত। উল্টোডাঙা বিধান সংঘে এবারে দৈবীশক্তির সেই অমূর্ত রূপই ফুটে উঠবে শৈল্পিক আঙ্গিকে। বিষয়ভাবনা: ‘অমূর্ত’।
58) সন্তোষপুর ত্রিকোণ পার্ক সর্বজনীন দুর্গাপূজোর সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। প্রকৃতি থেকে আহরিত নশ্বরপ্রক্রিয়া ছাড়া পুজো শুরু হয় না। বাঙালির কাছে শরৎ ঋতুর সব থেকে বড় পরিচায়ক কাশ আর শিউলি, যা দুর্গাপূজোরও বার্তাবহ। সর্বোপরি গ্রামবাংলার চিরন্তন মৃন্ময়ী প্রতিমা তৈরি হয় প্রায় সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপাদান থেকে যা বিসর্জনের পরে আবার প্রকৃতিতেই মিশে যায়। এই চেতনা নিয়েই পুজোর বিষয়ভাবনা: ‘প্রকৃতি’।
59) উত্তর কলকাতার মাণিকতলা স্মৃতি সংঘের মণ্ডপ। সীতাহরণের পরে রামের যে সংকট, শুধু সীতা-উদ্ধারই নয় রাবণের হাত থেকে সমগ্র পৃথিবীকে রক্ষা করা, সেই লঙ্কাপুরের কাহিনী নিয়েই উপস্থাপনা। এই অভীষ্টসিদ্ধির পথে তিরধনুকই তাঁর প্রধান সহায় শত্রুদমনেও যেমন, দেবীর আরাধনাতেও ঠিক ততটাই। রামের তিরধনুককে লক্ষাভেদের মূল প্রতীক হিসেবে ধরে নিয়ে বিষয়ভাবনা: ‘সংকল্প’।
60) দক্ষিণের ৭১ পল্লি বৈশাখী সর্বজনীন দুর্গোৎসব সমিতি: -র মণ্ডপের বিষয়ভাবনা: ‘মন্থন-দর্পণ’। আধুনিক সভ্যতার চরম ভোগবাদ ও দায়িত্বহীনতার জেরে নদী, সমুদ্র আর জলাশয়গুলো ঢেকে গেছে বিষাক্ত প্লাস্টিক, রাসায়নিক বর্জ্য আর আবর্জনার স্তূপে। মণ্ডপসজ্জায় এই সংকটকেই তুলে ধরা হয়েছে রূপক দর্পণ হিসেবে।
