২০ জুন পশ্চিমবঙ্গ দিবস, স্রষ্টা শ্যামাপ্রসাদের মূর্তি নির্মাণ

আগামী ২০ জুন, পশ্চিমবঙ্গ দিবসঃ 


আগামী ২০ জুন বর্তমান সরকার ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ শিরোপায় ঘোষণা করেছেন। যদিও পূর্ববর্তী শাসক সরকার বিনা যুক্তিতে ১ বৈশাখকে একই নামে ভূষিত করেছিলেন। তাল মিলিয়েছিল চটিচাটা কবি, বুদ্ধিজীবি ও শিল্পীকূল। কিন্তু ২০ জুন নিয়ে আমরা, রাস্ট্রবাদীরা এত সংবেদনশীল কেন? কী ঘটেছিল সেদিন? 


কী ঘটেছিল সেদিন? 


ব্রিটিশ সরকারের ৩ জুনের ঘোষণায় দেশভাগের সেই সঙ্গে বাংলা ভাগের কথা বলা হয়। ঠিক হয় বিধানসভার সদস্যরা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ও হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ—এই দু-ভাগে বিভক্ত হয়ে বাংলার ভাগ্য নির্ধারণ করবেন। 

তথ্য তালিকা :

- ১৯৪৬ সালের ১৬ই আগস্ট : ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে 

- ১৯৪৬ সালের ১৮ ও ১৯ আগস্ট: হিন্দুরা প্রতিহত করে, ১০০০০ মানুষ মারা যায়।

- ১৯৪৬ সালের ১০ ই অক্টোবর : নোয়াখালীর দাঙ্গা, ১০০০০ হিন্দুকে হত্যা করা হয়। 

- ১৯৪৭ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে শ্যামা প্রসাদ মুখার্জি হিন্দু মহা সভার নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করেন।

- ১৯৪৭ সালের ১৫ ই মার্চ হিন্দু মহা সভার ২ দিন ব্যাপী আলোচনা শোভা বসে কলকাতায়।

- ১৯৪৭ সালের ৪ ঠা এপ্রিল তারকেশ্বরে ৩ দিন ব্যাপী কনফারেন্স চলে এবং ৫০০০০ মানুষের সমাগম হয়।

- ১৯৪৭ সালের ১২ এপ্রিল মাউন্ট ব্যাটেন কে বারোজ গোপন চিঠি লেখেন ও তারকেশ্বরের সভার বিষয়ে জানান।

- ১৯৪৭ সালের ১৩ মে শ্যামা প্রসাদ গান্ধীর সঙ্গে দেখা করেন ও এই বিষয়ে আলোকপাত করেন।

- ১৯৪৭ সালের ২০ জুন বঙ্গীয় আইন পরিষদের সভায় বাঙালি হিন্দুর হোমল্যান্ড বা পশ্চিমবঙ্গ এর প্রস্তাব ৫৮ : ২১ ভোটে পাশ করান হয়।


বাংলা ভাগ সম্পর্কে সিদ্ধান্তে আসার জন্য বিধানসভার ঐতিহাসিক অধিবেশন বসে ২০ জুন, ১৯৪৭। ওই সভায় দলগত অবস্থান ছিল এরকম : মুসলিম লিগ-১১৪, কংগ্রেস–৮৬, ফজলুল হকের কৃষক প্রজাপার্টি-৩, নির্দল মুসলমান-৩, অ্যাংলো ইন্ডিয়ান-৪, ভারতীয় খ্রিষ্টান-৩, নির্দল তপসিলি–২, কমিউনিস্ট পার্টি-৩। সেদিন বিধানসভায় একটি নয়, কার্যত তিনটি অধিবেশন বসেছিল। 



১) প্রথমটি অবিভক্ত বিধানসভার অধিবেশন। অবিভক্ত বিধানসভার শুরুতেই কংগ্রেসের পক্ষ থেকে সমগ্র বাংলা ভারতের সংবিধান সভায় যোগ দেবে বলে প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। কিন্তু ওই প্রস্তাব ১২৬-৯০ ভোটে বাতিল হয়ে যায়। অর্থাৎ বাংলা ভারতে যাবে না। 


২) দ্বিতীয়টি হিন্দুপ্রধান অঞ্চলের প্রতিনিধিদের অধিবেশন। এই অধিবেশনে হিন্দু সদস্যরা স্বতন্ত্র কক্ষে মিলিত হয়ে ৫৮-২১ ভোটে বাংলা ভাগের সিদ্ধান্ত নেন। হিন্দু সদস্যদের ভোটে এভাবেই পশ্চিমবঙ্গের জন্ম স্থির হল। স্থির হল তারা ভারতের সংবিধান সভায় যোগ দেবে। 

   

৩) তৃতীয়টি মুসলমান প্রধান অঞ্চলের প্রতিনিধিদের অধিবেশন। একই দিনে মুসলমান সদস্যরা স্বতন্ত্র কক্ষে মিলিত হয়ে ১০৬-৩৫ ভোটে বাংলা ভাগের বিপক্ষে রায় দেন ও তারা বলেন বাংলা ভাগ অনিবার্য হলে পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানের নতুন সংবিধান সভায় যোগ দেবে। 


পশ্চিমবঙ্গের পক্ষে ভোট কমিউনিস্টদেরঃ


সেই সময় ১৯৪১ সালের জনগণনা অনুযায়ি অবিভক্ত বাংলার ১৬টি জেলাকে চিহ্নিত করা হয় মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলা হিসেবে। এগুলি হল — রংপুর, দিনাজপুর, মালদা, বগুড়া, রাজশাহী, পাবনা, ময়মনসিংহ, ঢাকা, ফরিদপুর, বাখরগঞ্জ, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, খুলনা, যশোর, নদিয়া ও মুর্শিদাবাদ। 


বাংলার অবশিষ্ট অংশ হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ বলে উল্লেখ করা হয়। প্রতিনিধিত্ব সেভাবেই হত। তখম হিন্দু কক্ষের সভাপতিত্ব করেছিলেন বর্ধমানের মহারাজা স্যার উদয়চাঁদ মহতাব। বিপক্ষের ২১ জন সদস্যের সকলেই ছিলেন মুসলিম লিগের সদস্য। হিন্দু সদস্যদের মধ্যে অকংগ্রেসি ছিলেন ৫ জন। এঁরা হলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় (হিন্দু মহাসভা), উদয়চাঁদ মহতাব (নির্দল), মুকুন্দবিহারি মল্লিক (তপশিল নির্দল), রতন লাল ব্রাহ্মণ ও জ্যোতি বসু (কমিউনিস্ট)। মুসলমান সদস্যদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন এইচ এস সুরাবর্দি (বাংলার প্রধানমন্ত্রী), লিগের সর্বভারতীয় নেতা ইস্পাহানি, বাংলা মুসলিম লিগের সম্পাদক আবুল হাসেম প্রমুখ। সেদিন কমিউনিস্ট দু’জন নেতা দলীয় মতের বিপক্ষে ভোট দেন পশ্চিমবঙ্গের পক্ষে। 


শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে পশ্চিমবঙ্গের স্রষ্টা কেন বলা হয় : 


কিন্তু প্রশ্ন একটাই তা হলে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে পশ্চিমবঙ্গের স্রষ্টা বলা হয় কেন? শ্যামাপ্রসাদ প্রথমে ভারত বা বাংলা কোনও বিভাগেরই সমর্থক ছিলেন না। ভারত ভাগের অনিবার্য পরিণতি স্বরূপ শ্যামাপ্রসাদ তখন বাংলা ভাগে সোচ্চার হলেন। তাঁর দাবি—যে হিন্দু-মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে দেশ ভাগ হচ্ছে, সে একই ভিত্তিতে প্রদেশও ভাগ করতে হবে। বাংলার গভর্নর বারোজের বুদ্ধিতে প্রধানমন্ত্রী সুরাবর্দী ‘স্বাধীন যুক্তবঙ্গের’ ধুয়া তোলেন। পূর্বাপর ভালমন্দ না বুঝে তার সঙ্গে গলা মেলান শরৎচন্দ্র বসু; এবং কিঞ্চিৎ দ্বিধাগ্রস্তচিত্তে কিরণশঙ্কর রায়। জিন্না-সুরাবর্দীর এই অভিসন্ধি একমাত্র বুঝেছিলেন শ্যামাপ্রসাদ। হিন্দু সমাজকে আহ্বান করে তিনি বলেন - "আমরা আমাদের মাতৃভূমি চাই এবং আমরা তা অর্জন করব—এটাই হোক আমাদের মূলমন্ত্র। হয় এখনই, নয়তো কখনোই নয়—এটাই হোক আমাদের স্লোগান।" কোথায় ও কবে বলেন? ১৯৪৭ খ্রীস্টাব্দের ৫ এপ্রিল তিনদিন ধরে বঙ্গীয় হিন্দু মহাসভা কনফারেন্স তারকেশ্বরের দ্বিতীয় দিনে বঙ্গীয় প্রাদেশিক হিন্দু মহাসভার বৈঠকে। 


স্বাধীনতায় আধা পশ্চিমবঙ্গ প্রাপ্তি হিন্দুদেরঃ 


জিন্না একসময় খোস মেজাজে মাউন্টব্যাটেনকে বলেছিলেন - “You must carry out a surgical operation” তখন জিন্না স্বপ্নেও ভাবেননি যে সে ছুরিকা শ্যামাপ্রসাদ তাঁর দিকে ঘুরিয়ে দিবেন এবং তাঁকে কাতরকণ্ঠে “ দয়া করে আমাকে পোকা-খাওয়া পাকিস্তান দেবেন না।" বলতে বাধ্য করবেন। কিন্তু কীভাবে পাকিস্তানকে কীটদ্রষ্ট করেছিলেন শ্যামাপ্রসাদ? সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল এই বাটোয়ারার সময় পাঞ্জাবের মুসলমান গরিষ্ঠ গুরুদাসপুর জেলা ভারতে আনার ব্যাপারে অনড় থাকেন। বাংলা ভাগের সময় কংগ্রেসের ও মুসলিম লিগের পক্ষে ছিলেন দুইজন করে বিচারপতি।


বাংলাভাগের সময় সম্পূর্ণ নদীয়া জেলা, মালদা, মুর্শিদাবাদ ও দিনাজপুর দেওয়া হল পাকিস্তানকে। অর্থাৎ উত্তরবঙ্গ থেকে দক্ষিনবঙ্গ বিচ্ছিন্ন। র‍্যাডক্লিফ সীমানা টানার সময় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলাকে পাকিস্তানকে দেওয়ায় এই বিপত্তি। ১৪ অগাস্ট এই চার জেলার মুসলিমরা আনন্দে পাকিস্তানের পতাকা তোলেন। হিন্দুরা এদিকে ফুঁসতে থাকেন কংগ্রেসের ওপরে ক্ষোভে। 


শ্যামাপ্রসাদ ছিনিয়ে আনলেন চার জেলাঃ 


শ্যামাপ্রসাদের সাথে কৃষ্ণনগরের মহারানী জ্যোতির্ময়ী দেবী প্রবল চাপ সৃষ্টি করেন লর্ড মাউন্টব্যাটেনের ওপরে। ভাগ হয় নদীয়া জেলা। ইছামতী ও মাথাভাঙা নদীকে সীমান্ত বিবেচনা করে কুষ্টিয়া, মেহেরপুর ও চুয়াডাঙা বাদ দিয়ে বাকিটা আনেন ভারতে। ওদিকে অবিভক্ত দিনাজপুরের বালুরঘাট, হিলি, গঙ্গারামপুর ও রায়গঞ্জ ঢোকে ভারতে। 


কিন্তু মালদা ও মুর্শিদাবাদ? একে তো মুসলিম প্রধান জেলা, তার ওপরে বাংলার নবাবদের প্রাক্তন রাজধানী, মুসলিম সেন্টিমেন্ট জড়িত ছিল। শ্যামাপ্রসাদ বিষয়টি বুঝেছিলেন। তিনি আরো বুঝেছিলেন যে ভাগীরথীর উৎসমুখ যদি পাকিস্তানে যায় তাহলে কলকাতা নদীবন্দর শুকিয়ে যাবে। জল টেনে নেবে পাকিস্তান। শ্যামাপ্রসাদ তখন স্থানীয় নেতা কৃষ্ণজীবন সান্যাল ও বিনয় সরকারকে নিয়ে কংগ্রেস ও লর্ড মাউন্টব্যাটেনের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন। সঙ্গে ছিলেন স্থানীয় হিন্দু মহাসভার নেতা স্বামী বলদেব আনন্দ গিরি। তিনি কলকাতায় দলবল নিয়ে এসে সীমানা কমিশনের অফিস ঘিরে সারারাত অবস্থান করেন। চাপের চোটে মালদার ১৫ টি থানার মধ্যে ১০ টি থানা ভারতে ঢোকে। 


কিন্তু মুর্শিদাবাদ? জিন্নাও অনড় ছিলেন। অনড় ছিলেন সর্দার প্যাটেল ও শ্যামাপ্রসাদ। তখন রফাসূত্র দেন নেহরু। হিন্দুপ্রধান খুলনার বিনিময়ে মুর্শিদাবাদ ঢুকল ভারতে। তাতে শ্যামাপ্রসাদ আপত্তি তুললেও কংগ্রেস আর ঝামেলা বাড়াতে চাইল না। ১৮ অগাস্ট এই বাটোয়ারা চুড়ান্ত হল। শ্যামাপ্রসাদ তাই নেহরুকে বলেছিলেন “আপনি ভারত ভাগ করেছেন, আর আমি পাকিস্তান ভাগ করেছি”।  


নেহরুর ভারতভাগ ও শ্যামাপ্রসাদের পাকিস্তান ভাগঃ 


বাটোয়ারার রাজনীতিতে ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে লড়েছেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। পাশে পেয়েছেন একমাত্র সর্দার প্যাটেলকে। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের হিন্দুদের পক্ষে এই লড়াই দীর্ঘদিনের। তিনি না থাকলে নদীয়া, মালদা, মুর্শিদাবাদ বা দিনাজপুর ছেড়েই দিলাম, কলকাতার ওপরে অধিকার দু’দেশেরই কায়েম থাকত। জওহরলাল নেহরু প্রধানমন্ত্রী হন কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির ভোটে নয় (সেখানে তার জামানত জব্দ হয়েছিল), গান্ধীর একনায়কোচিত নির্দেশে। কাশ্মীর ও চট্টগ্রাম ভারতের অংশ হত প্রথমে যদি সর্দার প্যাটেল প্রধানমন্ত্রী হতেন।


শুধুমাত্র শ্যামাপ্রসাদের এই লড়াকু অবদানের জন্যে হিন্দু মহাসভার সাংসদ কম হলেও জনমতের চাপে তাকে মন্ত্রীত্ব দিতে বাধ্য হন নেহরু। আজ এইজন্যে গুজরাটের নর্মদা জেলার ছোট্ট একটি দ্বীপে তৈরি করা সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের মূর্তি তৈরি করেন নরেন্দ্র মোদি যা এখন বিশ্বের সর্বোচ্চ মূর্তি - স্ট্যাচু অফ লিবার্টির প্রায় দ্বিগুণ। এর নাম 'স্ট্যাচু অফ ইউনিটি' বা 'ঐক্যের মূর্তি।' 


কলকাতায় বসতে চলেছে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ১২৫ ফুট স্ট্যাচু। সম্ভবত  আগামী ৬ জুলাই কলকাতায় এই স্ট্যাচু স্থাপনার জন্য ভূমি পূজন করা হবে। 

রামকেলি মেলা ২০২৬ : কামাখ্যায় সিদ্ধি লাভের আগে মালদার ঐতিহ্যবাহী মেলা

 বিবিধের মাঝে মহামিলনের এই দেশ ভারতবর্ষ আজও মানুষের ভিড়ে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় ধর্ম, মত, বর্ণ, আধ্যাত্মিক উপচারের বিভেদ। তাই শাক্ত সাধনায় সিদ্ধিলাভের জন্য তন্ত্রপীঠ কামাখ্যায় যাওয়ার আগে মোক্ষলাভের লক্ষ্যে বৈষ্ণব তীর্থ রামকেলির হাজির হন ভক্তবৃন্দেরা।  রবিবার (১৪. ০৬. ২০২৬) থেকে শুরু হচ্ছে গৌড়বঙ্গের আস্থা ও আবেগের উৎসব, রামকেলির মেলা। তার আগে এখন সাজোসাজো রব জেলাজুড়ে। দূরদূরান্ত থেকে মহদিপুরের রামকেলিধামে আসেন পুণ্যার্থীরা। এমনকি, ভিড় থাকে কারবারি দেরও। হরেক পসরা নিয়ে তাঁরাও হাজির এই মেলায় অংশ নেওয়ার জন্য। প্রায় সাতদিন আগে থেকেই তোড়জোড় শুরু হয়ে গিয়েছে তাঁদের। সেই প্রস্তুতি শেষ হবে ১৭ তারিখ, মেলা ভাঙার পরেই।



রামকেলি হয়ে অনেকেই চলে যান অসমের কামাখ্যায়, 'অম্বুবাচির মেলায় অংশ নিতে। কিন্তু, রামকেলি আর কামাখ্যার মধ্যে মিল কোথায়? বিশ্বাস যে, সবের মধ্যেই রয়েছে মোক্ষলাভ আর সিদ্ধিলাভ। তাই প্রতি বছর কামাখ্যা যাওয়ার আগে একবারের জন্য হলেও রামকেলি ভক্ত বৃন্দ ঘুরে যাই।' 


ভারতের অন্য সব মেলার মতো রামকেলির মেলার সঙ্গেও জড়িয়ে রয়েছে হরেক কিংবদন্তি। রামকেলির মেলার নামকরণ প্রসঙ্গে  'কথিত আছে ত্রেতাযুগে রামচন্দ্র বনবাসে যাওয়ার সময় সীতাদেবীকে সঙ্গে নিয়ে গৌড়ভূমেও এসেছিলেন। জ্যৈষ্ঠ সংক্রান্তি তিথিতে একটি কুণ্ডে সীতাদেবীর সঙ্গে জলকেলি করেন তিনি। সেই থেকেই নাম রামকেলি।' 



সীতাদেবী এই গয়েশ্বরী মন্দিরে তাঁর মাতৃকুলের উদ্দেশে পিণ্ডদান করেছিলেন। তারপর থেকেই এই জায়গাটি মাতৃগয়া নামে পরিচিতি পায়।' 


এখানেই শেষ নয়। এই মেলার সঙ্গে মিশে রয়েছে আরও অনেক ঐতিহাসিক কাহিনী। গৌড়ে হুসেন শাহের আগে রাজত্ব করেছিলেন পাল ও সেন বংশের রাজারা। তাঁদের রাজবাড়ি আজও রয়েছে এখানে। সেই সময় এই রামকেলি ছিল হিন্দু আচার সংস্কারের কেন্দ্র। সেই সময় তৈরি অনেক দেবদেবীর মূর্তি এখনও মাটির নীচ থেকে পাওয়া যায়। 



ত্রেতাযুগে রামচন্দ্রের পরে আধুনিককালে শ্রীচৈতন্যও জ্যৈষ্ঠ সংক্রান্তিতে এখানে এসে ভক্তদের কৃপা করেছিলেন। ইতিহাস গবেষকরা বলেন, '১৫১৫ খ্রিস্টাব্দের ১৪ জুন রামকেলিতে এসেছিলেন শ্রীচৈতন্যদেব। আর ১৫ জুন, হুসেন শাহের প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী সাকর মল্লিক আর দবির তাঁদের নামকরণ হয় রূপ গোস্বামী খাসকে বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষিত করেন। আর সনাতন গোস্বামী।' এই তীর্থে বলে একে অনেকে গুপ্ত বৃন্দাবন বৃন্দাবনের সংস্কৃতি তুলে ধরা হয় নামেও চেনেন।

অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের ফর্মে পরিবারের সব সদস্যের খুঁটিয়ে তথ্য কেন জেনে নিচ্ছে সরকার? আসল কারণ কি?


অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের ফর্ম প্রকাশ করেছে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার। কোন ওয়েবসাইটে অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের ফর্ম পাওয়া যাবে, সেই তথ্যও জানানো হয়েছে। তবে অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের অন্যতম আলোচনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এই প্রকল্পের ফর্ম।


https://socialsecurity.wb.gov.in এই পোর্টাল থেকে ১১ পাতার এই ফর্মে শুধুমাত্র আবেদনকারী নয়, আবেদনকারীর পরিবারের সদস্যদের সম্পর্কেও বিশদে তথ্য চাওয়া হয়েছে। ফর্ম টি সহজেই ডাউনলোড করে ফিল আপ করতে পারবেন।


পরিবারের সদস্যদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকে শুরু করে তাঁদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, উপার্জনের মাধ্যম, কর্মসংস্থানের ধরন, পরিবারের কেউ রাজ্য অথবা কেন্দ্রীয় সরকারি চাকরি করেন কি না, পেনশন পান কি না, জনপ্রতিনিধি হিসেবে কেউ কোনও পদে আছেন কি না, স্বাস্থ্য বিমা, পরিবারের কেউ আয়কর দেন কি না, এরকম একাধিক তথ্য খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জানতে চাওয়া হয়েছে।

পরিবারের কতজন সদস্য, বাড়ির ধরন, তাঁদের মোট জমির পরিমাণ, বাড়িতে কোনও যানবাহন আছে কি না, পরিবারের সদস্যদের ভোটার কার্ডের নম্বর, প্যান কার্ড থাকলে তার নম্বর দিতে হবে।

শুধু তাই নয়, পরিবারের সদস্যদের মধ্যে কেউ সিএএ-তে আবেদন করেছে কি না, এসআইআর-এ কারও নাম বাদ পড়েছে কি না, বাদ পড়লেও ট্রাইব্যুনালে আবেদন করা হয়েছে কি না, এই তথ্যগুলিও ফর্মে উল্লেখ করতে হবে।


কিন্তু কেন পরিবারের সদস্যদের তথ্য ফর্মে চাইছে সরকার?

অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের ফর্ম প্রকাশ করে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, এই ফর্মে বিশদে তথ্য চাওয়া হয়েছে। সরকার মা, বোনেদের মাসে ৩ হাজার টাকাও দিতে চায় এবং পরিবারের তথ্যও সংগ্রহ করতে চায়। কারণ সরকার রাজ্য এবং কেন্দ্রের বিভিন্ন সামাজিক প্রকল্পের সুবিধা মানুষকে দিতে চায়।'


মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, বিশদে তথ্য দিতে হলেও ফর্ম ফিল আপ করার জন্য রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে সাহায্য করা হবে। শুভেন্দু অধিকারী বলেন, এই ফর্মে অনেকগুলি তথ্য চাওয়া হয়েছে, ফর্ম পূরণে আমরা সহযোগিতা করব। বিডিও অফিস থেকে বিধায়কদের এই কাজে যুক্ত করা হবে। বিধায়কদের এটা একটি বড় কাজ। বিডিওদের সঙ্গে ভার্চুয়াল কর্মসূচি হবে। ১৫ থেকে ১৭ জনকল্যাণ শিবিরেও ফর্ম পূরণে সহযোগিতা করা হবে।'


লক্ষ্মীর ভাণ্ডার থেকে নেয়া শিক্ষা :

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এই বিষয়ে অভিযোগ করেছেন, পূর্বতন সরকারের আমলে শুরু হওয়া লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পে প্রায় ৩০ লক্ষ এমন উপভোক্তাদের চিহ্নিত করা গিয়েছে, যাঁরা আদৌ সরকারি এই অনুদান পাওয়ার যোগ্য নন। তাই অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার প্রকল্পের শুরু থেকেই বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে চাইছে রাজ্য সরকার। ফর্ম থেকে সংগৃহীত পরিবারের সব সদস্যদের বিশদ তথ্য থেকেই তাই আবেদনকারী মাসিক ৩ হাজার টাকা ভাতা পাওয়ার যোগ্য কি না, তা যাচাই করে নেবে রাজ্য সরকার।


অন্নপূর্ণা যোজনা নিয়ে কোন বিভ্রান্তি নয়

১লা জুন, ২০২৬ থেকে টাকা পাওয়ার আগে জেনে নিন আসল সত্য, পাড়ার চায়ের দোকানের আলোচনা বা হোয়াটসঅ্যাপের ভুলভাল মেসেজে কান দিয়ে প্যানিক করবেন না,কোনো যোগ্য মানুষ এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত না হন।


নিচের নিয়মগুলো ভালো করে মিলিয়ে নিন:

কারা এই টাকা পাবেন না (বয়সের শর্ত):

যাদের বয়স ২৫ বছরের কম কিংবা ৬০ বছরের বেশি, তারা এই সুবিধা পাবেন না। শুধুমাত্র ২৫ থেকে ৬০ বছর বয়সী মহিলারাই এই টাকা পাওয়ার যোগ্য।


স্বামীর বা পরিবারের অন্য কারো চাকরি/উপার্জন কি বাধা হবে?

একেবারেই নয়! আপনার স্বামী সরকারি বা বেসরকারি যত বড় অফিসারই হোন না কেন, কিংবা পরিবারের অন্য কেউ (বাবা, দাদা, ভাই, মা, বোন) যত ইচ্ছাই উপার্জন করুক বা ইনকাম ট্যাক্স দিক—তাতে আপনার টাকা পেতে কোনো অসুবিধা হবে না। শর্ত শুধু একটাই, আপনার নিজের যেন কোনো সরকারি ফিক্সড বেতনের চাকরি বা নিজস্ব ট্যাক্স দেওয়ার মতো আয় না থাকে।


কারা এই অনুদান পাবেন না (চাকরি ও করের শর্ত):

কোনো মহিলা যদি এই মুহূর্তে কেন্দ্র বা রাজ্য সরকার, সরকারি স্কুল, পঞ্চায়েত বা মিউনিসিপালিটির অধীনে কোনো ফিক্সড বেতনে চাকরি করেন, তবে তিনি টাকা পাবেন না।


যারা সরকারি চাকরি থেকে নিজে সরাসরি পেনশন পান, তারাও পাবেন না।


যারা বেসরকারি চাকরি বা নিজস্ব ব্যবসা (দোকান, বুটিক ইত্যাদি) করেন এবং বছরে ১২ লক্ষ টাকার ওপর আয় করে ইনকাম ট্যাক্স (Income Tax) দেন, তারা এই ৩০০০ টাকা পাবেন না। (তবে ব্যবসা/চাকরি থাকা সত্ত্বেও যদি আপনি ট্যাক্স স্ল্যাবের নিচে থাকেন এবং ইনকাম ট্যাক্স না দেন, তবে আপনি অবশ্যই টাকা পাবেন)।


পেনশন ও ফ্যামিলি পেনশনের নিয়ম:

স্বামী জীবিত আছেন এবং পেনশন পান, কিন্তু স্ত্রী গৃহবধূ—সেক্ষেত্রে স্ত্রী অবশ্যই অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের টাকা পাবেন।


কিন্তু, স্বামীর অবর্তমানে স্ত্রী যদি তাঁর জায়গায় 'ফ্যামিলি পেনশন' সরাসরি নিজের নামে পান, তবে তিনি আর এই যোজনার জন্য আবেদন করতে পারবেন না।


নাগরিকত্ব ও স্পেশাল ছাড় (এসআইআর/সিএএ নিয়ম):

২০২৬ সালের এসআইআর (SIR)-এ যাদের নাম বৈধ নাগরিক হিসেবে কাটা গেছে, তারা এই টাকা পাবেন না।


তবে দুটি বিশেষ ছাড় রয়েছে: ১) যারা সিএএ (CAA)-তে আবেদন করেছেন (সার্টিফিকেট এখনো পাননি), তারা টাকা পাবেন। ২) যাদের নাম ভুলবশত এসআইআর-এ ওঠেনি বা কাটা গেছে এবং তারা ট্রাইব্যুনালে অ্যাপিল করেছেন, তারাও টাকা পাবেন।


নতুন করে কি আবেদন করতে হবে?

হ্যাঁ। যারা এতদিন ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’-এর টাকা পাচ্ছিলেন, তারা ‘অন্নপূর্ণা যোজনা ভাণ্ডার’-এর ৩০০০ টাকা পাবেন। কিন্তু নতুন করে আবেদন করতে হবে। 


যারা এতদিন লক্ষ্মীর ভাণ্ডার পাননি বা যাদের সবেমাত্র ২৫ বছর বয়স হলো, তারা অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে নিজে বা সাইবার ক্যাফেতে গিয়ে নতুন রেসিপিয়েন্ট হিসেবে আবেদন করতে পারবেন।


ব্যাংক অ্যাকাউন্টের দুটি জরুরি কাজ (অবশ্যই করুন):

১) আধার লিঙ্ক: আপনার যে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা ঢুকবে, সেটির সাথে আধার কার্ড লিঙ্ক থাকা বাধ্যতামূলক, যাতে কোনো ভুতুড়ে অ্যাকাউন্ট আপনার টাকা না খেতে পারে।


২) ডিবিটি (DBT) অ্যাক্টিভেশন: আপনার যদি একাধিক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থাকে, তবে যে অ্যাকাউন্টে সরকারি সুবিধা পেতে চান, সেটিতে ব্যাংকে গিয়ে ‘ডাইরেক্ট বেনিফিট ট্রান্সফার’ বা ডিবিটি অপশনটি চালু করে নিন। এটি মাত্র কয়েক মিনিটের কাজ।

~~~