অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের ফর্মে পরিবারের সব সদস্যের খুঁটিয়ে তথ্য কেন জেনে নিচ্ছে সরকার? আসল কারণ কি?


অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের ফর্ম প্রকাশ করেছে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার। কোন ওয়েবসাইটে অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের ফর্ম পাওয়া যাবে, সেই তথ্যও জানানো হয়েছে। তবে অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের অন্যতম আলোচনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এই প্রকল্পের ফর্ম।


https://socialsecurity.wb.gov.in এই পোর্টাল থেকে ১১ পাতার এই ফর্মে শুধুমাত্র আবেদনকারী নয়, আবেদনকারীর পরিবারের সদস্যদের সম্পর্কেও বিশদে তথ্য চাওয়া হয়েছে। ফর্ম টি সহজেই ডাউনলোড করে ফিল আপ করতে পারবেন।


পরিবারের সদস্যদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকে শুরু করে তাঁদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, উপার্জনের মাধ্যম, কর্মসংস্থানের ধরন, পরিবারের কেউ রাজ্য অথবা কেন্দ্রীয় সরকারি চাকরি করেন কি না, পেনশন পান কি না, জনপ্রতিনিধি হিসেবে কেউ কোনও পদে আছেন কি না, স্বাস্থ্য বিমা, পরিবারের কেউ আয়কর দেন কি না, এরকম একাধিক তথ্য খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জানতে চাওয়া হয়েছে।

পরিবারের কতজন সদস্য, বাড়ির ধরন, তাঁদের মোট জমির পরিমাণ, বাড়িতে কোনও যানবাহন আছে কি না, পরিবারের সদস্যদের ভোটার কার্ডের নম্বর, প্যান কার্ড থাকলে তার নম্বর দিতে হবে।

শুধু তাই নয়, পরিবারের সদস্যদের মধ্যে কেউ সিএএ-তে আবেদন করেছে কি না, এসআইআর-এ কারও নাম বাদ পড়েছে কি না, বাদ পড়লেও ট্রাইব্যুনালে আবেদন করা হয়েছে কি না, এই তথ্যগুলিও ফর্মে উল্লেখ করতে হবে।


কিন্তু কেন পরিবারের সদস্যদের তথ্য ফর্মে চাইছে সরকার?

অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের ফর্ম প্রকাশ করে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, এই ফর্মে বিশদে তথ্য চাওয়া হয়েছে। সরকার মা, বোনেদের মাসে ৩ হাজার টাকাও দিতে চায় এবং পরিবারের তথ্যও সংগ্রহ করতে চায়। কারণ সরকার রাজ্য এবং কেন্দ্রের বিভিন্ন সামাজিক প্রকল্পের সুবিধা মানুষকে দিতে চায়।'


মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, বিশদে তথ্য দিতে হলেও ফর্ম ফিল আপ করার জন্য রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে সাহায্য করা হবে। শুভেন্দু অধিকারী বলেন, এই ফর্মে অনেকগুলি তথ্য চাওয়া হয়েছে, ফর্ম পূরণে আমরা সহযোগিতা করব। বিডিও অফিস থেকে বিধায়কদের এই কাজে যুক্ত করা হবে। বিধায়কদের এটা একটি বড় কাজ। বিডিওদের সঙ্গে ভার্চুয়াল কর্মসূচি হবে। ১৫ থেকে ১৭ জনকল্যাণ শিবিরেও ফর্ম পূরণে সহযোগিতা করা হবে।'


লক্ষ্মীর ভাণ্ডার থেকে নেয়া শিক্ষা :

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এই বিষয়ে অভিযোগ করেছেন, পূর্বতন সরকারের আমলে শুরু হওয়া লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পে প্রায় ৩০ লক্ষ এমন উপভোক্তাদের চিহ্নিত করা গিয়েছে, যাঁরা আদৌ সরকারি এই অনুদান পাওয়ার যোগ্য নন। তাই অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার প্রকল্পের শুরু থেকেই বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে চাইছে রাজ্য সরকার। ফর্ম থেকে সংগৃহীত পরিবারের সব সদস্যদের বিশদ তথ্য থেকেই তাই আবেদনকারী মাসিক ৩ হাজার টাকা ভাতা পাওয়ার যোগ্য কি না, তা যাচাই করে নেবে রাজ্য সরকার।


অন্নপূর্ণা যোজনা নিয়ে কোন বিভ্রান্তি নয়

১লা জুন, ২০২৬ থেকে টাকা পাওয়ার আগে জেনে নিন আসল সত্য, পাড়ার চায়ের দোকানের আলোচনা বা হোয়াটসঅ্যাপের ভুলভাল মেসেজে কান দিয়ে প্যানিক করবেন না,কোনো যোগ্য মানুষ এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত না হন।


নিচের নিয়মগুলো ভালো করে মিলিয়ে নিন:

কারা এই টাকা পাবেন না (বয়সের শর্ত):

যাদের বয়স ২৫ বছরের কম কিংবা ৬০ বছরের বেশি, তারা এই সুবিধা পাবেন না। শুধুমাত্র ২৫ থেকে ৬০ বছর বয়সী মহিলারাই এই টাকা পাওয়ার যোগ্য।


স্বামীর বা পরিবারের অন্য কারো চাকরি/উপার্জন কি বাধা হবে?

একেবারেই নয়! আপনার স্বামী সরকারি বা বেসরকারি যত বড় অফিসারই হোন না কেন, কিংবা পরিবারের অন্য কেউ (বাবা, দাদা, ভাই, মা, বোন) যত ইচ্ছাই উপার্জন করুক বা ইনকাম ট্যাক্স দিক—তাতে আপনার টাকা পেতে কোনো অসুবিধা হবে না। শর্ত শুধু একটাই, আপনার নিজের যেন কোনো সরকারি ফিক্সড বেতনের চাকরি বা নিজস্ব ট্যাক্স দেওয়ার মতো আয় না থাকে।


কারা এই অনুদান পাবেন না (চাকরি ও করের শর্ত):

কোনো মহিলা যদি এই মুহূর্তে কেন্দ্র বা রাজ্য সরকার, সরকারি স্কুল, পঞ্চায়েত বা মিউনিসিপালিটির অধীনে কোনো ফিক্সড বেতনে চাকরি করেন, তবে তিনি টাকা পাবেন না।


যারা সরকারি চাকরি থেকে নিজে সরাসরি পেনশন পান, তারাও পাবেন না।


যারা বেসরকারি চাকরি বা নিজস্ব ব্যবসা (দোকান, বুটিক ইত্যাদি) করেন এবং বছরে ১২ লক্ষ টাকার ওপর আয় করে ইনকাম ট্যাক্স (Income Tax) দেন, তারা এই ৩০০০ টাকা পাবেন না। (তবে ব্যবসা/চাকরি থাকা সত্ত্বেও যদি আপনি ট্যাক্স স্ল্যাবের নিচে থাকেন এবং ইনকাম ট্যাক্স না দেন, তবে আপনি অবশ্যই টাকা পাবেন)।


পেনশন ও ফ্যামিলি পেনশনের নিয়ম:

স্বামী জীবিত আছেন এবং পেনশন পান, কিন্তু স্ত্রী গৃহবধূ—সেক্ষেত্রে স্ত্রী অবশ্যই অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের টাকা পাবেন।


কিন্তু, স্বামীর অবর্তমানে স্ত্রী যদি তাঁর জায়গায় 'ফ্যামিলি পেনশন' সরাসরি নিজের নামে পান, তবে তিনি আর এই যোজনার জন্য আবেদন করতে পারবেন না।


নাগরিকত্ব ও স্পেশাল ছাড় (এসআইআর/সিএএ নিয়ম):

২০২৬ সালের এসআইআর (SIR)-এ যাদের নাম বৈধ নাগরিক হিসেবে কাটা গেছে, তারা এই টাকা পাবেন না।


তবে দুটি বিশেষ ছাড় রয়েছে: ১) যারা সিএএ (CAA)-তে আবেদন করেছেন (সার্টিফিকেট এখনো পাননি), তারা টাকা পাবেন। ২) যাদের নাম ভুলবশত এসআইআর-এ ওঠেনি বা কাটা গেছে এবং তারা ট্রাইব্যুনালে অ্যাপিল করেছেন, তারাও টাকা পাবেন।


নতুন করে কি আবেদন করতে হবে?

হ্যাঁ। যারা এতদিন ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’-এর টাকা পাচ্ছিলেন, তারা ‘অন্নপূর্ণা যোজনা ভাণ্ডার’-এর ৩০০০ টাকা পাবেন। কিন্তু নতুন করে আবেদন করতে হবে। 


যারা এতদিন লক্ষ্মীর ভাণ্ডার পাননি বা যাদের সবেমাত্র ২৫ বছর বয়স হলো, তারা অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে নিজে বা সাইবার ক্যাফেতে গিয়ে নতুন রেসিপিয়েন্ট হিসেবে আবেদন করতে পারবেন।


ব্যাংক অ্যাকাউন্টের দুটি জরুরি কাজ (অবশ্যই করুন):

১) আধার লিঙ্ক: আপনার যে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা ঢুকবে, সেটির সাথে আধার কার্ড লিঙ্ক থাকা বাধ্যতামূলক, যাতে কোনো ভুতুড়ে অ্যাকাউন্ট আপনার টাকা না খেতে পারে।


২) ডিবিটি (DBT) অ্যাক্টিভেশন: আপনার যদি একাধিক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থাকে, তবে যে অ্যাকাউন্টে সরকারি সুবিধা পেতে চান, সেটিতে ব্যাংকে গিয়ে ‘ডাইরেক্ট বেনিফিট ট্রান্সফার’ বা ডিবিটি অপশনটি চালু করে নিন। এটি মাত্র কয়েক মিনিটের কাজ।

~~~

কোন মন্তব্য নেই: