আগামী ২০ জুন, পশ্চিমবঙ্গ দিবসঃ
আগামী ২০ জুন বর্তমান সরকার ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ শিরোপায় ঘোষণা করেছেন। যদিও পূর্ববর্তী শাসক সরকার বিনা যুক্তিতে ১ বৈশাখকে একই নামে ভূষিত করেছিলেন। তাল মিলিয়েছিল চটিচাটা কবি, বুদ্ধিজীবি ও শিল্পীকূল। কিন্তু ২০ জুন নিয়ে আমরা, রাস্ট্রবাদীরা এত সংবেদনশীল কেন? কী ঘটেছিল সেদিন?
কী ঘটেছিল সেদিন?
ব্রিটিশ সরকারের ৩ জুনের ঘোষণায় দেশভাগের সেই সঙ্গে বাংলা ভাগের কথা বলা হয়। ঠিক হয় বিধানসভার সদস্যরা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ও হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ—এই দু-ভাগে বিভক্ত হয়ে বাংলার ভাগ্য নির্ধারণ করবেন।
তথ্য তালিকা :
- ১৯৪৬ সালের ১৬ই আগস্ট : ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে
- ১৯৪৬ সালের ১৮ ও ১৯ আগস্ট: হিন্দুরা প্রতিহত করে, ১০০০০ মানুষ মারা যায়।
- ১৯৪৬ সালের ১০ ই অক্টোবর : নোয়াখালীর দাঙ্গা, ১০০০০ হিন্দুকে হত্যা করা হয়।
- ১৯৪৭ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে শ্যামা প্রসাদ মুখার্জি হিন্দু মহা সভার নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করেন।
- ১৯৪৭ সালের ১৫ ই মার্চ হিন্দু মহা সভার ২ দিন ব্যাপী আলোচনা শোভা বসে কলকাতায়।
- ১৯৪৭ সালের ৪ ঠা এপ্রিল তারকেশ্বরে ৩ দিন ব্যাপী কনফারেন্স চলে এবং ৫০০০০ মানুষের সমাগম হয়।
- ১৯৪৭ সালের ১২ এপ্রিল মাউন্ট ব্যাটেন কে বারোজ গোপন চিঠি লেখেন ও তারকেশ্বরের সভার বিষয়ে জানান।
- ১৯৪৭ সালের ১৩ মে শ্যামা প্রসাদ গান্ধীর সঙ্গে দেখা করেন ও এই বিষয়ে আলোকপাত করেন।
- ১৯৪৭ সালের ২০ জুন বঙ্গীয় আইন পরিষদের সভায় বাঙালি হিন্দুর হোমল্যান্ড বা পশ্চিমবঙ্গ এর প্রস্তাব ৫৮ : ২১ ভোটে পাশ করান হয়।
বাংলা ভাগ সম্পর্কে সিদ্ধান্তে আসার জন্য বিধানসভার ঐতিহাসিক অধিবেশন বসে ২০ জুন, ১৯৪৭। ওই সভায় দলগত অবস্থান ছিল এরকম : মুসলিম লিগ-১১৪, কংগ্রেস–৮৬, ফজলুল হকের কৃষক প্রজাপার্টি-৩, নির্দল মুসলমান-৩, অ্যাংলো ইন্ডিয়ান-৪, ভারতীয় খ্রিষ্টান-৩, নির্দল তপসিলি–২, কমিউনিস্ট পার্টি-৩। সেদিন বিধানসভায় একটি নয়, কার্যত তিনটি অধিবেশন বসেছিল।
১) প্রথমটি অবিভক্ত বিধানসভার অধিবেশন। অবিভক্ত বিধানসভার শুরুতেই কংগ্রেসের পক্ষ থেকে সমগ্র বাংলা ভারতের সংবিধান সভায় যোগ দেবে বলে প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। কিন্তু ওই প্রস্তাব ১২৬-৯০ ভোটে বাতিল হয়ে যায়। অর্থাৎ বাংলা ভারতে যাবে না।
২) দ্বিতীয়টি হিন্দুপ্রধান অঞ্চলের প্রতিনিধিদের অধিবেশন। এই অধিবেশনে হিন্দু সদস্যরা স্বতন্ত্র কক্ষে মিলিত হয়ে ৫৮-২১ ভোটে বাংলা ভাগের সিদ্ধান্ত নেন। হিন্দু সদস্যদের ভোটে এভাবেই পশ্চিমবঙ্গের জন্ম স্থির হল। স্থির হল তারা ভারতের সংবিধান সভায় যোগ দেবে।
৩) তৃতীয়টি মুসলমান প্রধান অঞ্চলের প্রতিনিধিদের অধিবেশন। একই দিনে মুসলমান সদস্যরা স্বতন্ত্র কক্ষে মিলিত হয়ে ১০৬-৩৫ ভোটে বাংলা ভাগের বিপক্ষে রায় দেন ও তারা বলেন বাংলা ভাগ অনিবার্য হলে পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানের নতুন সংবিধান সভায় যোগ দেবে।
পশ্চিমবঙ্গের পক্ষে ভোট কমিউনিস্টদেরঃ
সেই সময় ১৯৪১ সালের জনগণনা অনুযায়ি অবিভক্ত বাংলার ১৬টি জেলাকে চিহ্নিত করা হয় মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলা হিসেবে। এগুলি হল — রংপুর, দিনাজপুর, মালদা, বগুড়া, রাজশাহী, পাবনা, ময়মনসিংহ, ঢাকা, ফরিদপুর, বাখরগঞ্জ, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, খুলনা, যশোর, নদিয়া ও মুর্শিদাবাদ।
বাংলার অবশিষ্ট অংশ হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ বলে উল্লেখ করা হয়। প্রতিনিধিত্ব সেভাবেই হত। তখম হিন্দু কক্ষের সভাপতিত্ব করেছিলেন বর্ধমানের মহারাজা স্যার উদয়চাঁদ মহতাব। বিপক্ষের ২১ জন সদস্যের সকলেই ছিলেন মুসলিম লিগের সদস্য। হিন্দু সদস্যদের মধ্যে অকংগ্রেসি ছিলেন ৫ জন। এঁরা হলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় (হিন্দু মহাসভা), উদয়চাঁদ মহতাব (নির্দল), মুকুন্দবিহারি মল্লিক (তপশিল নির্দল), রতন লাল ব্রাহ্মণ ও জ্যোতি বসু (কমিউনিস্ট)। মুসলমান সদস্যদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন এইচ এস সুরাবর্দি (বাংলার প্রধানমন্ত্রী), লিগের সর্বভারতীয় নেতা ইস্পাহানি, বাংলা মুসলিম লিগের সম্পাদক আবুল হাসেম প্রমুখ। সেদিন কমিউনিস্ট দু’জন নেতা দলীয় মতের বিপক্ষে ভোট দেন পশ্চিমবঙ্গের পক্ষে।
শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে পশ্চিমবঙ্গের স্রষ্টা কেন বলা হয় :
কিন্তু প্রশ্ন একটাই তা হলে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে পশ্চিমবঙ্গের স্রষ্টা বলা হয় কেন? শ্যামাপ্রসাদ প্রথমে ভারত বা বাংলা কোনও বিভাগেরই সমর্থক ছিলেন না। ভারত ভাগের অনিবার্য পরিণতি স্বরূপ শ্যামাপ্রসাদ তখন বাংলা ভাগে সোচ্চার হলেন। তাঁর দাবি—যে হিন্দু-মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে দেশ ভাগ হচ্ছে, সে একই ভিত্তিতে প্রদেশও ভাগ করতে হবে। বাংলার গভর্নর বারোজের বুদ্ধিতে প্রধানমন্ত্রী সুরাবর্দী ‘স্বাধীন যুক্তবঙ্গের’ ধুয়া তোলেন। পূর্বাপর ভালমন্দ না বুঝে তার সঙ্গে গলা মেলান শরৎচন্দ্র বসু; এবং কিঞ্চিৎ দ্বিধাগ্রস্তচিত্তে কিরণশঙ্কর রায়। জিন্না-সুরাবর্দীর এই অভিসন্ধি একমাত্র বুঝেছিলেন শ্যামাপ্রসাদ। হিন্দু সমাজকে আহ্বান করে তিনি বলেন - "আমরা আমাদের মাতৃভূমি চাই এবং আমরা তা অর্জন করব—এটাই হোক আমাদের মূলমন্ত্র। হয় এখনই, নয়তো কখনোই নয়—এটাই হোক আমাদের স্লোগান।" কোথায় ও কবে বলেন? ১৯৪৭ খ্রীস্টাব্দের ৫ এপ্রিল তিনদিন ধরে বঙ্গীয় হিন্দু মহাসভা কনফারেন্স তারকেশ্বরের দ্বিতীয় দিনে বঙ্গীয় প্রাদেশিক হিন্দু মহাসভার বৈঠকে।
স্বাধীনতায় আধা পশ্চিমবঙ্গ প্রাপ্তি হিন্দুদেরঃ
জিন্না একসময় খোস মেজাজে মাউন্টব্যাটেনকে বলেছিলেন - “You must carry out a surgical operation” তখন জিন্না স্বপ্নেও ভাবেননি যে সে ছুরিকা শ্যামাপ্রসাদ তাঁর দিকে ঘুরিয়ে দিবেন এবং তাঁকে কাতরকণ্ঠে “ দয়া করে আমাকে পোকা-খাওয়া পাকিস্তান দেবেন না।" বলতে বাধ্য করবেন। কিন্তু কীভাবে পাকিস্তানকে কীটদ্রষ্ট করেছিলেন শ্যামাপ্রসাদ? সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল এই বাটোয়ারার সময় পাঞ্জাবের মুসলমান গরিষ্ঠ গুরুদাসপুর জেলা ভারতে আনার ব্যাপারে অনড় থাকেন। বাংলা ভাগের সময় কংগ্রেসের ও মুসলিম লিগের পক্ষে ছিলেন দুইজন করে বিচারপতি।
বাংলাভাগের সময় সম্পূর্ণ নদীয়া জেলা, মালদা, মুর্শিদাবাদ ও দিনাজপুর দেওয়া হল পাকিস্তানকে। অর্থাৎ উত্তরবঙ্গ থেকে দক্ষিনবঙ্গ বিচ্ছিন্ন। র্যাডক্লিফ সীমানা টানার সময় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলাকে পাকিস্তানকে দেওয়ায় এই বিপত্তি। ১৪ অগাস্ট এই চার জেলার মুসলিমরা আনন্দে পাকিস্তানের পতাকা তোলেন। হিন্দুরা এদিকে ফুঁসতে থাকেন কংগ্রেসের ওপরে ক্ষোভে।
শ্যামাপ্রসাদ ছিনিয়ে আনলেন চার জেলাঃ
শ্যামাপ্রসাদের সাথে কৃষ্ণনগরের মহারানী জ্যোতির্ময়ী দেবী প্রবল চাপ সৃষ্টি করেন লর্ড মাউন্টব্যাটেনের ওপরে। ভাগ হয় নদীয়া জেলা। ইছামতী ও মাথাভাঙা নদীকে সীমান্ত বিবেচনা করে কুষ্টিয়া, মেহেরপুর ও চুয়াডাঙা বাদ দিয়ে বাকিটা আনেন ভারতে। ওদিকে অবিভক্ত দিনাজপুরের বালুরঘাট, হিলি, গঙ্গারামপুর ও রায়গঞ্জ ঢোকে ভারতে।
কিন্তু মালদা ও মুর্শিদাবাদ? একে তো মুসলিম প্রধান জেলা, তার ওপরে বাংলার নবাবদের প্রাক্তন রাজধানী, মুসলিম সেন্টিমেন্ট জড়িত ছিল। শ্যামাপ্রসাদ বিষয়টি বুঝেছিলেন। তিনি আরো বুঝেছিলেন যে ভাগীরথীর উৎসমুখ যদি পাকিস্তানে যায় তাহলে কলকাতা নদীবন্দর শুকিয়ে যাবে। জল টেনে নেবে পাকিস্তান। শ্যামাপ্রসাদ তখন স্থানীয় নেতা কৃষ্ণজীবন সান্যাল ও বিনয় সরকারকে নিয়ে কংগ্রেস ও লর্ড মাউন্টব্যাটেনের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন। সঙ্গে ছিলেন স্থানীয় হিন্দু মহাসভার নেতা স্বামী বলদেব আনন্দ গিরি। তিনি কলকাতায় দলবল নিয়ে এসে সীমানা কমিশনের অফিস ঘিরে সারারাত অবস্থান করেন। চাপের চোটে মালদার ১৫ টি থানার মধ্যে ১০ টি থানা ভারতে ঢোকে।
কিন্তু মুর্শিদাবাদ? জিন্নাও অনড় ছিলেন। অনড় ছিলেন সর্দার প্যাটেল ও শ্যামাপ্রসাদ। তখন রফাসূত্র দেন নেহরু। হিন্দুপ্রধান খুলনার বিনিময়ে মুর্শিদাবাদ ঢুকল ভারতে। তাতে শ্যামাপ্রসাদ আপত্তি তুললেও কংগ্রেস আর ঝামেলা বাড়াতে চাইল না। ১৮ অগাস্ট এই বাটোয়ারা চুড়ান্ত হল। শ্যামাপ্রসাদ তাই নেহরুকে বলেছিলেন “আপনি ভারত ভাগ করেছেন, আর আমি পাকিস্তান ভাগ করেছি”।
নেহরুর ভারতভাগ ও শ্যামাপ্রসাদের পাকিস্তান ভাগঃ
বাটোয়ারার রাজনীতিতে ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে লড়েছেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। পাশে পেয়েছেন একমাত্র সর্দার প্যাটেলকে। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের হিন্দুদের পক্ষে এই লড়াই দীর্ঘদিনের। তিনি না থাকলে নদীয়া, মালদা, মুর্শিদাবাদ বা দিনাজপুর ছেড়েই দিলাম, কলকাতার ওপরে অধিকার দু’দেশেরই কায়েম থাকত। জওহরলাল নেহরু প্রধানমন্ত্রী হন কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির ভোটে নয় (সেখানে তার জামানত জব্দ হয়েছিল), গান্ধীর একনায়কোচিত নির্দেশে। কাশ্মীর ও চট্টগ্রাম ভারতের অংশ হত প্রথমে যদি সর্দার প্যাটেল প্রধানমন্ত্রী হতেন।
শুধুমাত্র শ্যামাপ্রসাদের এই লড়াকু অবদানের জন্যে হিন্দু মহাসভার সাংসদ কম হলেও জনমতের চাপে তাকে মন্ত্রীত্ব দিতে বাধ্য হন নেহরু। আজ এইজন্যে গুজরাটের নর্মদা জেলার ছোট্ট একটি দ্বীপে তৈরি করা সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের মূর্তি তৈরি করেন নরেন্দ্র মোদি যা এখন বিশ্বের সর্বোচ্চ মূর্তি - স্ট্যাচু অফ লিবার্টির প্রায় দ্বিগুণ। এর নাম 'স্ট্যাচু অফ ইউনিটি' বা 'ঐক্যের মূর্তি।'
কলকাতায় বসতে চলেছে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ১২৫ ফুট স্ট্যাচু। সম্ভবত আগামী ৬ জুলাই কলকাতায় এই স্ট্যাচু স্থাপনার জন্য ভূমি পূজন করা হবে।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন